- ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর “সমকামী প্রতিরোধ আন্দোলন, গোপালগঞ্জ” নামে একটি ফেসবুক পেজ চালুর মধ্য দিয়ে গোষ্ঠীটি প্রকাশ্যে আসে। এর প্রধান ও উদ্যোক্তা Sarzil Tibro (সারজিল তীব্র)।
- মাত্র তিন সপ্তাহে গোষ্ঠীটি অনলাইনে সমকামী মানুষদের “পাকড়াও”, “নির্মূল” ও গোপালগঞ্জ থেকে “তাড়ানো”র আহ্বান জানায়, এলাকাভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের ডাক দেয় এবং পুড়িয়ে হত্যার একটি ঘটনাকে নজির হিসেবে প্রচার করে।
- অনলাইন উসকানি মাঠে গড়ায়: ২৩ অক্টোবর এক ট্রান্সজেন্ডার নারীর বাসায় সংঘবদ্ধ হামলা এবং ২৯ অক্টোবর গোপালগঞ্জ শহরে এক ব্যক্তিকে “সমকামী” আখ্যা দিয়ে প্রচণ্ড মারধর।
- গোষ্ঠীটি রাজনৈতিক বিরোধীদেরও লক্ষ্যবস্তু করেছে: পেজ চালুর দুই দিনের মাথায় বিরোধিতাকারী একজন স্থানীয় বিএনপি নেতাকে ছবি ও এলাকাসহ প্রকাশ্যে চিহ্নিত করা হয়।
- হামলাকারীরা নিজেরাই নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করেছেন এবং “ধারাবাহিক সিরিজ চলতেই থাকবে” বলে আরও হামলার ঘোষণা দিয়েছেন।
- উদ্যোক্তা জঙ্গিবাদ ও নাশকতার একাধিক মামলায় অভিযুক্ত মুফতি হারুন ইজহারকে নিজের “শাইখুনা” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
- গোষ্ঠীটি ফেসবুকের নজরদারি এড়াতে পরিকল্পিতভাবে শব্দ ভেঙে লেখে এবং প্রচারণার ছবি তৈরিতে Meta-র নিজস্ব এআই টুল (Meta AI) ব্যবহার করেছে।
- গোষ্ঠীর কাঠামো দুই স্তরের: জঙ্গি-সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা প্ররোচনা দেন, আর সহযোগীদের বেশিরভাগ কনটেন্ট ক্রিয়েটর, যাঁদের জন্য এলজিবিটিআইকিউ+ বিদ্বেষ দ্রুত ফলোয়ার ও আয় বাড়ানোর পথ।
- Meta এসব বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট না সরিয়ে এলজিবিটিআইকিউ+ জনগোষ্ঠীকে আরও ঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে এবং মনিটাইজেশনের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে বিদ্বেষ ছড়ানোদের অর্থায়ন করছে।
ঘটনাক্রম
| তারিখ (২০২৬) | ঘটনা |
|---|---|
| ৮ অক্টোবর | “সমকামী প্রতিরোধ আন্দোলন, গোপালগঞ্জ” ফেসবুক পেজ চালু। একই দিন আইনজীবী শেখ আল-আমিনের ভিডিও বার্তা: এলজিবিটিআইকিউ+ ব্যক্তিদের হুমকি, নির্মূলের ঘোষণা ও সারজিল তীব্রের পাশে থাকার ঘোষণা। |
| ৯ অক্টোবর | পেজে ঘোষণা: “সারজিল তীব্র একা নয়”, এই গ্রুপের সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত। একই দিন AL-Amin Hossain ভিডিও পোস্ট করে গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা ঘোষণা করেন। |
| ১০ অক্টোবর | বিএনপির স্থানীয় নেতা রুবেলকে ছবি ও এলাকাসহ চিহ্নিত করে পেজে পোস্ট। |
| ১১ অক্টোবর | “আপনার এলাকার তথ্য” দেওয়ার আহ্বান; “গোপালগঞ্জ পবিত্র হোক”। |
| ১২ অক্টোবর | পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাকে নজির হিসেবে উল্লেখ করে “প্রতিরোধ”-এর আহ্বান। |
| ২০ অক্টোবর | Meta AI দিয়ে তৈরি ছবিতে আবারও এলাকার তথ্য দেওয়ার আহ্বান। |
| ২৩ অক্টোবর | ট্রান্সজেন্ডার নারী রজত শুভ্রের বাসায় সংঘবদ্ধ হামলা, মারধর, লুটপাট ও মাদক দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা। গোষ্ঠীর “প্রথম সফল মব”। |
| ২৪ অক্টোবর | গোষ্ঠীর পেজে Usman Kazi-র ভিডিও বার্তা: গোপালগঞ্জ থেকে এলজিবিটিআইকিউ+ ব্যক্তিদের তাড়ানোর হুমকি ও অন্যদের আহ্বান। |
| ২৫ অক্টোবর | রজতের ওপর হামলায় নেতৃত্বদানকারী মো. আবদুল্লাহ মোল্লার ১০ হাজার ফলোয়ার অর্জনের ঘোষণা। |
| ২৬ অক্টোবর | রজত শুভ্রের মুক্তির পর গোষ্ঠীর পেজে AL-Amin Hossain-এর পুলিশবিরোধী ভিডিও। |
| ২৯ অক্টোবর | গোপালগঞ্জ শহরে পলাশ শাহকে “সমকামী” আখ্যা দিয়ে প্রচণ্ড মারধর; নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ। |
১. গোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশ
২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর “সমকামী প্রতিরোধ আন্দোলন, গোপালগঞ্জ” নামে একটি ফেসবুক পেজ চালু হয়। পেজে নামটি লেখা হয় “স.ম.কামী প্রতিরোধ আন্দোলন,গোপালগঞ্জ।” এভাবে, অর্থাৎ “সমকামী” শব্দটি ডট দিয়ে ভেঙে। পেজটির একটি গোল লোগো রয়েছে।
পেজ: facebook.com/profile.php?id=61595445471258

পরদিন, ৯ অক্টোবর, পেজে ঘোষণা দেওয়া হয় যে “সারজিল তীব্র একা নয়”, এই গ্রুপের সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে গোষ্ঠীটি নিজেকে একক ব্যক্তির উদ্যোগ নয়, বরং একটি সংগঠিত দল হিসেবে উপস্থাপন করে।
২. প্রধান ও উদ্যোক্তা: Sarzil Tibro (সারজিল তীব্র)
Monitoring BD-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, গোষ্ঠীটির প্রধান ও উদ্যোক্তা ফেসবুক প্রোফাইল “Sarzil Tibro”-এর ব্যবহারকারী। একই ইউজারনেমে (“sarziltibro”) তাঁর একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টও রয়েছে।
- ফেসবুক: facebook.com/sarziltibro
- ইনস্টাগ্রাম: instagram.com/sarziltibro


মুফতি হারুন ইজহারের প্রতি আনুগত্য
Sarzil Tibro রাজনৈতিক মতাদর্শে মুফতি হারুন ইজহারের অনুসারী। তিনি ফেসবুকে হারুন ইজহারের বইয়ের প্রচার করেছেন।

নিজের একটি ফেসবুক পোস্টে তিনি হারুন ইজহারকে “শাইখুনা” (আমাদের শাইখ) সম্বোধন করে তাঁকে সামনে থেকে দেখা ও তাঁর পাশে থেকে খেদমত করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। পোস্টে হারুন ইজহারের ফেসবুক পেজ ট্যাগ করা হয়। পোস্টের উল্লেখযোগ্য অংশ:
শাইখুনা Harun Izhar কে সামনে থেকে দেখা এটা ছিল আমার জীবনের এক অমূল্য মুহূর্ত। ব্যক্তি পুজা করতেছিনা তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি। … তাকে শুধু দেখিই নাই তার পাশে থেকে খেদমত করার সৌভাগ্য হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। … তাকে দেখে মনে হলো, আল্লাহর সত্যদীনের একজন প্রকৃত সৈনিক কেমন হয়, বিনয়ী, দৃঢ়, শান্ত অথচ জ্বলন্ত এক চেতনায় ভরপুর।

মুফতি হারুন ইজহার কে
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুফতি হারুন ইজহার হেফাজতে ইসলামের বিলুপ্ত কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। ২০২১ সালের ২৯ এপ্রিল র্যাব তাঁকে চট্টগ্রামের লালখান বাজার মাদ্রাসা থেকে গ্রেপ্তার করে। তিনি ২৮টি মামলায় কারাগারে ছিলেন এবং পরে জামিনে মুক্তি পান; পুলিশ জানায়, আগের ভূমিকার কারণে তাঁকে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে [১]। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ ও জেএমবির নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে [২]। ঢাকায় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে হামলা পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে ছিল এবং বিস্ফোরক ও এসিড আইনের মামলায় তিনি আসামি হন [৩]। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ডানপন্থী ইসলামিস্ট গোষ্ঠীগুলো ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। এ সময় জঙ্গিবাদের বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত অসংখ্য ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পান; কারা কর্তৃপক্ষের হিসাবে এই সংখ্যা তিন শতাধিক, যাঁদের মধ্যে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিও রয়েছেন [৭]। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলা থেকে আদালত হারুন ইজহারকেও অব্যাহতি দেন [৪]।
আইএস-এর পতাকা হাতে ছবি
Sarzil Tibro নিজের ফেসবুকে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর পতাকা হাতে এবং মাথায় ব্যাজ পরা অবস্থায় ছবি পোস্ট করেছেন।

৩. গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত অন্যরা
Monitoring BD-এর বিশ্লেষণে গোষ্ঠীটির কাঠামো দুই স্তরের। শীর্ষে আছেন জঙ্গি-সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা, যিনি মতাদর্শিক নেতৃত্ব দেন এবং অন্যদের প্ররোচিত করেন। তাঁর চারপাশে যাঁরা যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের বেশিরভাগ ফেসবুকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে সক্রিয়; তাঁরা ভিডিও বার্তা, ঘোষণা ও নির্যাতনের দৃশ্য নিজেদের প্রোফাইলে প্রচার করেন। নিচে এই সহযোগীদের পরিচয় দেওয়া হলো।
অ্যাডভোকেট শেখ আল-আমিন
পেজ ঘোষণার পর ৮ অক্টোবর “অ্যাডভোকেট শেখ আল আমিন” নামের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করা হয়। এতে তিনি এলজিবিটিআইকিউ+ ব্যক্তিদের হুমকি দেন, তাঁদের নির্মূল করার ঘোষণা দেন এবং সারজিল তীব্রের পাশে থাকার ঘোষণা দেন। তাঁর পেশাগত নামফলক অনুযায়ী তিনি এলএলবি (অনার্স) ও এলএলএম ডিগ্রিধারী এবং গোপালগঞ্জ জজ কোর্টের একজন অ্যাডভোকেট।
ফেসবুক: facebook.com/profile.php?id=100005973709294




Usman Kazi

Usman Kazi একটি ভিডিও পোস্টে সমকামীদের “পশ্চিমা এজেন্ডা” আখ্যা দিয়ে তাঁদের গোপালগঞ্জ থেকে তাড়ানোর ঘোষণা দেন এবং Sarzil Tibro-র সঙ্গে যোগ দেন। Monitoring BD-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, সমকামী মানুষদের মারধর, হুমকি ও নির্যাতনে তিনি সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
গোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ: ২৪ অক্টোবর, রজত শুভ্রের বাসায় হামলার পরদিন, Usman Kazi “সমকামী প্রতিরোধ আন্দোলন, গোপালগঞ্জ”-এর ফেসবুক পেজে নিজে ভিডিও বার্তা দেন। এতে তিনি গোপালগঞ্জ থেকে এলজিবিটিআইকিউ+ ব্যক্তিদের তাড়ানোর হুমকি দেন এবং অন্যদেরও এতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। পরে একই ভিডিও তিনি নিজের প্রোফাইলে শেয়ার করেন। ২৯ অক্টোবর পলাশ শাহকে মারধরের ঘটনায়ও তিনি জড়িত এবং নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে সেই মারধরের পোস্ট দেন (অনুচ্ছেদ ৫ দেখুন)।
ফেসবুক: facebook.com/usman.kazi.joy.2024


AL-Amin Hossain

AL-Amin Hossain (শেখ) অ্যাডভোকেট শেখ আল-আমিন থেকে ভিন্ন ব্যক্তি। ৯ অক্টোবর, যেদিন পেজে “সারজিল তীব্র একা নয়” ঘোষণা আসে, সেদিনই তিনি নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে ভিডিও পোস্ট করে গোষ্ঠীর সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা ঘোষণা করেন।
২৬ অক্টোবর, রজত শুভ্রকে পুলিশ ছেড়ে দেওয়ার পর, তিনি গোষ্ঠীর ফেসবুক পেজে পুলিশের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে ভিডিও পোস্ট করেন। এতে স্পষ্ট হয় যে গোষ্ঠীটি রজতের ওপর হামলাকে নিজেদের কার্যক্রম হিসেবেই দেখছে এবং ভুক্তভোগীর মুক্তিতে পুলিশের ওপর চাপ তৈরি করছে।
ফেসবুক: facebook.com/alaminhossaintitubd



মো. আবদুল্লাহ মোল্লা

মো. আবদুল্লাহ মোল্লা গোপালগঞ্জ জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মুয়াজ্জিন হিসেবে পরিচিত; তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলেও এই পেশাগত পরিচয়ের উল্লেখ রয়েছে। ২৩ অক্টোবর রজত শুভ্রের বাসায় হামলায় তিনি নেতৃত্ব দেন এবং ২৯ অক্টোবর পলাশ শাহকে নির্যাতনের ভিডিও নিজের ফেসবুকে প্রকাশ করেন (অনুচ্ছেদ ৫ দেখুন)।
রজত শুভ্রের ওপর হামলার দুই দিন পর, ২৫ অক্টোবর, তিনি নিজের প্রোফাইলে ১০ হাজার ফলোয়ার অর্জনের ঘোষণা দিয়ে পোস্ট করেন। এলজিবিটিআইকিউ+ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক পোস্ট ছড়িয়েই তিনি এই ফলোয়ার অর্জন করেন (অনুচ্ছেদ ৬ দেখুন)।
ফেসবুক: facebook.com/abdullah.molla.50702

৪. অনলাইন উসকানি: পেজের পোস্ট
১০ অক্টোবর: রাজনৈতিক বিরোধীকে লক্ষ্যবস্তু করা: স্থানীয় বিএনপি নেতা
পেজ চালুর মাত্র দুই দিনের মাথায় গোষ্ঠীটি প্রথম নেতিবাচক প্রচারণা চালায় বিএনপির একজন স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে। ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিটে “বিএনপির নাম ব্যবহার করে হুমকি-ধামকি ও হয়রানির অভিযোগ। কে এই রুবেল?” শিরোনামে পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্টে অভিযোগ করা হয়, বেদগ্রামের রুবেল বিএনপির নাম ও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে “LGBTQ+ সমকামী বিষয়ক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিদের” হুমকি, হয়রানি ও গালিগালাজ করেছেন। পোস্টে রুবেলের দুটি ছবি দেওয়া হয়, যার একটিতে লাল বৃত্ত দিয়ে তাঁকে চিহ্নিত করা হয়।
পোস্টের ভাষা “নিরপেক্ষ তদন্ত” ও “আইনের শাসন”-এর মতো শব্দে সাজানো হলেও এর মাধ্যমে গোষ্ঠীর বিরোধিতাকারী একজন ব্যক্তিকে নাম, এলাকা ও ছবিসহ জনসমক্ষে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

১১ অক্টোবর: এলাকাভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের আহ্বান
আপনার এলাকার তথ্য, দেওয়ার দায়িত্ব আপনার।
পবিত্র করার দায়িত্ব আমাদের সবার ।
তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন, সবাইকে সচেতন করুন।
সমক।মীতা নিপাত যাক, আপনার আমার গোপালগঞ্জ পবিত্র হোক।
পোস্টটিতে নিজ নিজ এলাকার সমকামী মানুষদের তথ্য পেজকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়। গোষ্ঠীটি বিভিন্ন এলাকা থেকে এলাকাভিত্তিক সদস্য সংগ্রহ করে। এই আহ্বান ও সদস্য সংগ্রহ মিলিয়ে গোষ্ঠীটি সমকামী মানুষদের ওপর নজরদারির একটি এলাকাভিত্তিক কাঠামো গড়ে তুলছে। “গোপালগঞ্জ পবিত্র হোক” কথাটি একটি জনগোষ্ঠীকে এলাকা থেকে উচ্ছেদের আহ্বান।

১২ অক্টোবর: পুড়িয়ে হত্যাকে নজির হিসেবে প্রচার
হযরত আলী (রা.) তার সময়ে দুই জন সম-কামিকে পুড়িয়ে হত্যা করেন ।
আমরা কী প্রতিরোধ ও করতে পারবো না?
১২ অক্টোবর সকাল ৭টা ৭ মিনিটের এই পোস্টে পুড়িয়ে হত্যার একটি ঘটনাকে নজির হিসেবে উপস্থাপন করে “প্রতিরোধ”-এর আহ্বান জানানো হয়। ধর্মীয় বর্ণনা ব্যবহার করে সমকামী মানুষদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। পোস্টটিতে ৫৮টি প্রতিক্রিয়া, ৯টি মন্তব্য ও ৭টি শেয়ার হয়, যা পেজের অন্য পোস্টগুলোর তুলনায় বেশি।

২০ অক্টোবর: Meta AI দিয়ে তৈরি ছবিতে আবারও তথ্য সংগ্রহের আহ্বান
নিজের এলাকার তথ্য দিয়ে সাহায্য করুন। সমকামী প্রতিরোধ আন্দোলন,গোপালগঞ্জ। এর নিকট
১১ অক্টোবরের তথ্য সংগ্রহের আহ্বান ৯ দিন পর আবারও দেওয়া হয়, যা থেকে বোঝা যায় তথ্য সংগ্রহ একটি চলমান কার্যক্রম। ছবিটির কোণে “Meta AI” জলছাপ রয়েছে; অর্থাৎ ঘৃণামূলক এই প্রচারণার ছবিটি ফেসবুকের মালিক প্রতিষ্ঠান Meta-র নিজস্ব এআই টুল দিয়ে তৈরি। পোস্টটিতে ২৭টি প্রতিক্রিয়া ও ২টি মন্তব্য রয়েছে।

সমকামীদের “পাকড়াও” করার আহ্বান
গোষ্ঠীটি সমকামী মানুষদের “পাকড়াও” করার আহ্বান জানিয়েও পোস্ট দিয়েছে।

নজরদারি এড়ানোর কৌশল
গোষ্ঠীটি ধারাবাহিকভাবে “সমকামী” শব্দটি ভেঙে লেখে: পেজের নামে “স.ম.কামী”, ১১ অক্টোবরের পোস্টে “সমক।মীতা”, ১২ অক্টোবরের পোস্টে “সম-কামি”। অথচ ২০ অক্টোবরের ছবির ভেতরে শব্দটি পুরোপুরি লেখা, কারণ ছবির ভেতরের লেখা সাধারণত লেখা-শনাক্তকরণে ধরা পড়ে না। এ থেকে বোঝা যায়, ফেসবুকের স্বয়ংক্রিয় নজরদারি এড়াতে গোষ্ঠীটি জেনেবুঝে এই কৌশল ব্যবহার করছে।
৫. অনলাইন থেকে মাঠে: সংঘবদ্ধ হামলা
২৩ অক্টোবর: ট্রান্সজেন্ডার নারী রজত শুভ্রের বাসায় হামলা
গোষ্ঠীটির “প্রথম সফল মব” ঘটে ২৩ অক্টোবর। গোপালগঞ্জে ট্রান্সজেন্ডার নারী রজত শুভ্রের বাসায় একদল ব্যক্তি প্রবেশ করে তাঁকে ও তাঁর এক ট্রান্সজেন্ডার বন্ধুকে অবরুদ্ধ করে মারধর করে। তল্লাশির নামে ঘরের জিনিসপত্র তছনছ ও লুটপাট করা হয়। কন্ডম খুঁজে বের করে দুজনকে হেনস্তা করা হয় এবং তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন ও লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বাসার ভেতরে তাঁদের অবরুদ্ধ রেখে বাইরে যেতে বাধা দেওয়া হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় মারধর করা হয়।
Monitoring BD-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, হামলাকারীরা চারটি ইয়াবা বড়ি বাসায় রেখে সেগুলো উদ্ধারের দাবি করেন এবং মারধর ও ভয়ভীতি দেখিয়ে দুজনের কাছ থেকে মাদক সেবনের স্বীকারোক্তি আদায় করেন। এরপর হামলাকারীরাই দুজনকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। অনধিকার প্রবেশ, মারধর ও লুটপাটের জন্য হামলাকারীদের আটক না করে পুলিশ ভুক্তভোগী দুজনকেই হেফাজতে নেয়; তবে একই দিন তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এই হামলায় নেতৃত্ব দেন মো. আবদুল্লাহ মোল্লা। “সমকামী প্রতিরোধ আন্দোলন, গোপালগঞ্জ”-এর সদস্যরা রজতের বাসায় প্রবেশ করে তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেন। ঘটনাটি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ভিডিও প্রতিবেদন ও একটি ফেসবুক ভিডিওতে উঠে আসে [৫]।
ঘটনার পরদিন, ২৪ অক্টোবর, একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে “খদ্দেরের রেট ১,০০০ টাকা! গোপালগঞ্জে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের ডেরায় মিলল ইয়াবা ও গোপন ডায়েরি” শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশিত হয় [৬]।
২৯ অক্টোবর: পলাশ শাহকে “সমকামী” আখ্যা দিয়ে মারধর
২৯ অক্টোবর গোপালগঞ্জ শহরে গোষ্ঠীটি পলাশ শাহ নামের এক ব্যক্তিকে “সমকামী” আখ্যা দিয়ে প্রচণ্ড মারধর করে। এ ঘটনায় Usman Kazi ও মো. আবদুল্লাহ মোল্লা দুজনেই জড়িত এবং দুজনই নিজ নিজ ফেসবুক প্রোফাইলে ঘটনার পোস্ট দেন।
মো. আবদুল্লাহ মোল্লা নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করে লেখেন:
গোপালগঞ্জ শহরে আরেকজন সমকামী কট, কি চান্দরা কেমন দিলাম?
একই পোস্টের মন্তব্যে তিনি লেখেন:
ধারাবাহিক সিরিজ চলতেই থাকবে
“আরেকজন” শব্দটি ইঙ্গিত দেয় যে এটি প্রথম ঘটনা নয়; আর “ধারাবাহিক সিরিজ চলতেই থাকবে” কথাটি ভবিষ্যতে আরও হামলার প্রকাশ্য ঘোষণা।


৬. বিশ্লেষণ: কেন “সংঘবদ্ধ উগ্রবাদী ইসলামিস্ট মব গোষ্ঠী”
সংঘবদ্ধ: গোষ্ঠীটির একটি নাম, লোগো ও ফেসবুক পেজ রয়েছে; একজন ঘোষিত উদ্যোক্তা রয়েছেন; প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে “আরও অনেকে জড়িত”। এলাকাভিত্তিক সদস্য সংগ্রহ ও বারবার এলাকার তথ্য চাওয়ার মাধ্যমে একটি কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। একাধিক সদস্য একই ঘটনার পোস্ট নিজ নিজ প্রোফাইলে দিয়েছেন, যা সমন্বিত কার্যক্রমের প্রমাণ।
উগ্রবাদী ইসলামিস্ট: উদ্যোক্তা জঙ্গিবাদ ও নাশকতার মামলায় অভিযুক্ত একজন ধর্মীয় নেতাকে “শাইখুনা” হিসেবে মানেন, তাঁর বই প্রচার করেন এবং আইএস-এর পতাকা হাতে ছবি পোস্ট করেছেন। পেজটি ধর্মীয় বর্ণনা ব্যবহার করে পুড়িয়ে হত্যাকে নজির হিসেবে প্রচার করেছে। হামলার নেতৃত্বদানকারী একজন সরকারি মডেল মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে পরিচিত।
মব: গোষ্ঠীটি “পাকড়াও”, “নির্মূল” ও “তাড়ানো”র আহ্বান জানিয়েছে এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে অন্তত দুটি দলবদ্ধ শারীরিক হামলায় জড়িত হয়েছে। হামলাকারীরা নিজেরাই নির্যাতনের ভিডিও প্রকাশ করে দায় স্বীকার করেছেন এবং আরও হামলার ঘোষণা দিয়েছেন।
ক্রমবর্ধমান সহিংসতা: ঘটনাক্রমে স্পষ্ট ধাপ দেখা যায়: পেজ চালু ও হুমকি (৮–৯ অক্টোবর), বিরোধীকে চিহ্নিত করা (১০ অক্টোবর), তথ্য সংগ্রহ (১১ ও ২০ অক্টোবর), হত্যার নজির প্রচার (১২ অক্টোবর), বাসায় হামলা (২৩ অক্টোবর), প্রকাশ্যে মারধর ও ভিডিও প্রচার (২৯ অক্টোবর)।
লক্ষ্যবস্তু শুধু সমকামী মানুষ নন: ট্রান্সজেন্ডার নারী, “সমকামী” হিসেবে চিহ্নিত যে কেউ এবং গোষ্ঠীর বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক নেতাও আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
নেতৃত্ব ও প্ররোচনা
গোষ্ঠীর চালিকাশক্তি উদ্যোক্তার মতাদর্শ। জঙ্গিবাদের মামলায় অভিযুক্ত একজন ধর্মীয় নেতার প্রতি তাঁর প্রকাশ্য আনুগত্য এবং আইএস-এর পতাকা হাতে ছবি দেখায়, এই উদ্যোগের পেছনে উগ্রবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শ কাজ করছে। তিনি পেজের মাধ্যমে সমকামী মানুষদের বিরুদ্ধে “প্রতিরোধ”-এর ডাক দেন, ধর্মীয় বর্ণনা দিয়ে সহিংসতাকে বৈধতা দেন এবং অন্যদের সেই ডাকে সাড়া দিতে প্ররোচিত করেন। পেজ চালুর দিনই একজন আইনজীবী প্রকাশ্যে তাঁর পাশে থাকার ঘোষণা দেন, এবং পরের দিনগুলোতে একের পর এক সহযোগী যুক্ত হন।
ঘৃণার অর্থনীতি: কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও মনিটাইজেশন
উদ্যোক্তার সহযোগীদের বেশিরভাগ ফেসবুক কনটেন্ট ক্রিয়েটর। Monitoring BD-এর পর্যবেক্ষণে, বাংলাদেশে এলজিবিটিআইকিউ+ জনগোষ্ঠীকে হুমকি দিয়ে বা তাঁদের বিরুদ্ধে পোস্ট করে দ্রুত ফলোয়ার বাড়ানো যায়। ফলোয়ার ও এনগেজমেন্ট যত বাড়ে, ফেসবুকের মনিটাইজেশনের মাধ্যমে আয়ের পথ তত দ্রুত প্রশস্ত হয়। ফলে এখানে বিদ্বেষ শুধু মতাদর্শ নয়, একটি লাভজনক কনটেন্ট কৌশলও। নির্যাতনের ভিডিও নিজের প্রোফাইলে প্রকাশ করা, “কেমন দিলাম?” জাতীয় ক্যাপশন এবং “ধারাবাহিক সিরিজ চলতেই থাকবে” ঘোষণা এই প্রবণতারই অংশ: সহিংসতা নিজেই হয়ে উঠছে প্রচারের কনটেন্ট।
নিজের মুখে প্রমাণ: রজত শুভ্রের বাসায় হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার মাত্র দুই দিন পর, ২৫ অক্টোবর, মো. আবদুল্লাহ মোল্লা নিজের প্রোফাইলে ১০ হাজার ফলোয়ার অর্জনের ঘোষণা দেন। পোস্টটিতে একজন মন্তব্যকারী লেখেন:
রজত শুভ্রের জন্য হইলো মনে হয়
অর্থাৎ তাঁর নিজের অনুসারীদের চোখেও স্পষ্ট যে, এই ফলোয়ার এসেছে একজন ট্রান্সজেন্ডার নারীর ওপর হামলার প্রচার থেকে। এর চার দিন পর, ২৯ অক্টোবর, তিনি পলাশ শাহকে নির্যাতনের ভিডিও প্রকাশ করে ঘোষণা দেন: “ধারাবাহিক সিরিজ চলতেই থাকবে”। সহিংসতা থেকে ফলোয়ার, আর ফলোয়ার থেকে আরও সহিংসতা: এই চক্র একজন অভিযুক্তের নিজের পোস্টেই প্রমাণিত।

এভাবে দুই স্তর একে অপরকে শক্তি জোগায়। উদ্যোক্তা মতাদর্শিক বৈধতা ও লক্ষ্য ঠিক করে দেন; কনটেন্ট ক্রিয়েটররা সেই বার্তা ছড়িয়ে দেন এবং মাঠে প্রয়োগ করেন, আর বিনিময়ে পান ফলোয়ার, প্রভাব ও আয়।
৭. রাষ্ট্র ও প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা
পুলিশ: ২৩ অক্টোবরের ঘটনায় পুলিশ হামলাকারীদের আটক না করে ভুক্তভোগীদেরই হেফাজতে নেয়। এতে হামলাকারীদের সাজানো মাদকের অভিযোগ কার্যত স্বীকৃতি পায়, এবং ছয় দিনের মাথায় একই ব্যক্তির নেতৃত্বে আরেকটি হামলা ঘটে। ২৬ অক্টোবর, রজত শুভ্রকে ছেড়ে দেওয়ার পর, গোষ্ঠীর সদস্য AL-Amin Hossain পেজে ভিডিও পোস্ট করে পুলিশের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর প্রকাশ্য চাপ তৈরির চেষ্টা।
Meta: বিদ্বেষের প্ল্যাটফর্ম ও পরোক্ষ অর্থায়ন
গোষ্ঠীটির পেজ এবং সদস্যদের প্রোফাইলে হত্যার নজির, “পাকড়াও” ও “নির্মূল”-এর আহ্বান এবং নির্যাতনের ভিডিও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রকাশ্যে রয়েছে। সহিংসতার উসকানি Meta-র নিজস্ব কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডেও নিষিদ্ধ; তবু এসব কনটেন্ট সরানো হয়নি। Meta এসব বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট না সরিয়ে বাংলাদেশের এলজিবিটিআইকিউ+ জনগোষ্ঠীকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত এবং ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
পরোক্ষ অর্থায়ন: যে প্ল্যাটফর্মে বিদ্বেষ ছড়িয়ে ফলোয়ার ও এনগেজমেন্ট বাড়ে, এবং সেই এনগেজমেন্ট মনিটাইজেশনের মাধ্যমে আয়ে রূপ নেয়, সেখানে বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট না সরানোর অর্থ হলো এলজিবিটিআইকিউ+ বিদ্বেষী উগ্রবাদীদের পরোক্ষভাবে অর্থায়ন করা। বিদ্বেষ থেকে আয়ের এই চক্র ভাঙতে Meta কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি।
Meta AI-এর ব্যবহার: গোষ্ঠীটি প্রচারণার ছবি তৈরিতে Meta-র নিজস্ব এআই টুল ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ Meta শুধু বিদ্বেষ ছড়ানোর প্ল্যাটফর্মই নয়, বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট তৈরির হাতিয়ারও জোগাচ্ছে।
নজরদারি এড়ানো থেকে প্রকাশ্য বিদ্বেষ: শুরুতে গোষ্ঠীটি শব্দ ভেঙে লিখে ফেসবুকের নজরদারি এড়ানোর কৌশল নিয়েছিল। কিন্তু এখন সদস্যরা সরাসরি, নিজের নামে, এমনকি নির্যাতনের ভিডিওসহ ঘৃণা ছড়াচ্ছেন। এতেও Meta তেমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি। এ থেকে বোঝা যায়, নজরদারি এড়ানোর কৌশলের চেয়েও বড় সমস্যা Meta-র নিষ্ক্রিয়তা।
দায় এড়ানোর সংস্কৃতি: ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে Meta তার বিদ্বেষমূলক আচরণ সংক্রান্ত নীতি শিথিল করে; নতুন নীতিতে লিঙ্গ বা যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে কাউকে “মানসিকভাবে অসুস্থ” বা “অস্বাভাবিক” বলার অনুমতি দেওয়া হয় [৮]। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে সমলৈঙ্গিক সম্পর্ক এখনো অপরাধ হিসেবে গণ্য এবং এলজিবিটিআইকিউ+ মানুষ নিয়মিত মব সহিংসতার শিকার হন, সেখানে এই শিথিলতা এবং প্রকাশ্য সহিংসতার উসকানিতেও পদক্ষেপ না নেওয়া Meta-র দায় এড়ানোর সংস্কৃতিকে স্পষ্ট করে।
৮. সুপারিশ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশ
- রজত শুভ্র ও পলাশ শাহের ওপর হামলার ঘটনায় হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ, তদন্ত ও গ্রেপ্তার নিশ্চিত করা।
- ২৩ অক্টোবর ভুক্তভোগীদের হেফাজতে নেওয়া এবং হামলাকারীদের ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের তদন্ত।
- “ধারাবাহিক সিরিজ চলতেই থাকবে” ঘোষণা আমলে নিয়ে গোপালগঞ্জের এলজিবিটিআইকিউ+ ও ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের জরুরি সুরক্ষা।
- পেজ ও সদস্যদের পোস্টে হত্যার উসকানি ও সহিংসতার আহ্বান আমলে নিয়ে আইনি ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও গোপালগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি
- একটি জনগোষ্ঠীকে “নির্মূল”-এর ঘোষণা দেওয়ায় অ্যাডভোকেট শেখ আল-আমিনের পেশাগত আচরণের তদন্ত।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন
- গোপালগঞ্জ জেলা মডেল মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে পরিচিত মো. আবদুল্লাহ মোল্লার হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া ও নির্যাতনের ভিডিও প্রচারের বিষয়ে তদন্ত ও ব্যবস্থা।
Meta
- “সমকামী প্রতিরোধ আন্দোলন, গোপালগঞ্জ” পেজ এবং সংশ্লিষ্ট প্রোফাইলের সহিংসতার উসকানিমূলক কনটেন্ট ও নির্যাতনের ভিডিও দ্রুত অপসারণ এবং ভুক্তভোগীদের ভিডিও আর ছড়াতে না দেওয়া।
- ভাঙা শব্দ (“স.ম.কামী”, “সমক।মীতা”, “সম-কামি”) ও ছবির ভেতরের লেখা শনাক্তে বাংলা কনটেন্ট মডারেশন জোরদার করা।
- Meta AI দিয়ে ঘৃণামূলক প্রচারণার ছবি তৈরি ঠেকাতে সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া।
- এলজিবিটিআইকিউ+ বিদ্বেষ ও সহিংসতার উসকানি ছড়ানো অ্যাকাউন্টগুলোর মনিটাইজেশন অবিলম্বে বন্ধ করা এবং বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট থেকে আয়ের পথ রুদ্ধ করা।
- বাংলাদেশে বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট সংক্রান্ত অভিযোগ ও গৃহীত পদক্ষেপের তথ্য প্রকাশ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
- লিঙ্গ ও যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে বিদ্বেষ অনুমোদনকারী ২০২৫ সালের নীতি পরিবর্তন প্রত্যাহার করা।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও নাগরিক সমাজ
- গোপালগঞ্জের ঘটনাগুলোর স্বতঃপ্রণোদিত তদন্ত ও তথ্যানুসন্ধান।
- ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা।
পদ্ধতি
এই প্রতিবেদন গোষ্ঠীর ফেসবুক পেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকাশ্য ফেসবুক প্রোফাইল ও পোস্ট পর্যবেক্ষণ, স্ক্রিনশট সংরক্ষণ, প্রকাশিত সংবাদ এবং Monitoring BD-এর মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তৈরি। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে গোষ্ঠীটি বা এর উদ্যোক্তার বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। পোস্টের উদ্ধৃতি মূল বানান অপরিবর্তিত রেখে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফোন নম্বর ও ব্যক্তিগত ঠিকানা প্রকাশ করা হয়নি।
তথ্যসূত্র
- দ্য ডেইলি স্টার বাংলা — কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন হেফাজতের শীর্ষ নেতা মুফতি হারুন
- বাংলা ট্রিবিউন — হেফাজতে উগ্রপন্থীদের নেতৃত্ব দিতেন মুফতি হারুন ইজহার (২৯ এপ্রিল ২০২১)
- বিডিনিউজ২৪ — চট্টগ্রাম, ২৩ মে ২০২৩
- দেশ রূপান্তর — মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেন ইসলামি বক্তা আমির হামজাসহ ছয়জন (২ সেপ্টেম্বর ২০২৪)
- নাগরিক টিভি — ভিডিও প্রতিবেদন; ফেসবুক ভিডিও
- ডেইলি বাংলা পোস্ট — খদ্দেরের রেট ১,০০০ টাকা! গোপালগঞ্জে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের ডেরায় মিলল ইয়াবা ও গোপন ডায়েরি (২৪ অক্টোবর ২০২৬)
- যুগান্তর — ৫ আগস্টের পর জঙ্গিবাদের মামলায় অভিযুক্তদের জামিনে মুক্তি বিষয়ক প্রতিবেদন (এপ্রিল ২০২৫)
- PolitiFact — New Meta content rules let users call LGBTQ+ people ‘mentally ill’ (১০ জানুয়ারি ২০২৫)
